লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৩

অনিন্দিতা ভ্রু তুলে তাকাল,
“কী কাজ?”
“বাইরে যাই,”—অরিন্দম নিজেই একটু অবাক হল নিজের কথায়, “এত বছরের চাকরিতে প্রথমবার ভাবলাম, হাফ–ডে–র বিকেলে আমি চাই, কারও সঙ্গে বসে এক কাপ চা খেতে। অফিসের ক্যান্টিনে না, বাইরে। যদি তোমার আপত্তি না থাকে।”
কয়েক সেকেন্ড অনিন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তার চোখে অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা নরম আলোও ফুটে উঠল—
“এই মানুষটা তো সবসময় ‘চাই’–এর জায়গায় ‘দায়িত্ব’ শব্দটা ব্যবহার করে, আজ প্রথমবার বলল—‘আমি চাই।’”

“আপনি জানেন, আপনি একটা ভয়ানক কথা বলে ফেললেন?”—সে হাসল, “আমাদের অফিসে কেউ গল্পে লিখলে হয়তো এভাবেই লিখত—‘সেই বিকেলে, যখন টিম–ম্যানেজার প্রথম HR–এর মেয়েকে অফিসের বাইরে চায়ের প্রস্তাব দিল।’”
অরিন্দম হেসে ফেলল,
“গল্প লেখার মতো ঘটনা নয় এটা।  আমরা দু’জন মানুষ—একজনের সংসার আছে, একজনের নেই; একজন অফিসের উপরের ধাপে, আরেকজন নিচের ধাপে। দু’জনেই ক্লান্ত। এ বিশাল শহরে দু’জন ক্লান্ত মানুষ একটু চা খেতে গেলে কী গল্প হয়?”
অনিন্দিতা মাথা একটু কাত করল,
“একটা গল্প হয় না, যখন কেউ নিজের ক্লান্তিকে প্রথম স্বীকার করে। অফিসে আপনার এত সহকর্মী, বন্ধু আছে—আজ আপনি আমার নামটাই প্রথম মনে করলেন?”
প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু তাতে কোনো কটাক্ষ নেই।

অরিন্দম এক মুহূর্ত থেমে সোজা গলায় বলল,
“এখানে শুধু দু’জন মানুষ আছি, যারা সারাক্ষণ অন্যদের কথা শুনি, অথচ নিজের কথা কাউকে বলি না—তুমি আর আমি। তাই।”
এই এক বাক্যে বড় একটি সত্যি বলে ফেলল সে—নিজেকেও অবাক করে দিয়ে।
অনিন্দিতা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে। চা খেতে যাই। তবে একটা শর্ত আছে।”
“কি শর্ত?”
“আজকের এই আধা ঘণ্টার জন্য আপনার জীবনে কোনো ‘স্যার’, কোনো ‘ম্যানেজার’, কোনো ‘HR এক্সিকিউটিভ’ থাকবে না।  থাকব শুধু দুজন মানুষ—অরিন্দম আর অনিন্দিতা।  পারবেন?”

শর্তটা শুনে অরিন্দমের বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত হালকা ভয় ঢুকে গেল।
“প্রতিদিন এতগুলো পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটা হঠাৎ করে মুছে ফেলতে বলা—এও এক ধরনের নগ্ন হওয়া,” সে মনে মনে ভাবল।
তবু খুব আস্তে বলল,
“চেষ্টা করব।”

বাইরে পা রাখা

অফিসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দু’জনই একবার করে চারদিকে তাকাল—
রাস্তার দিকে,
লোকজনের দিকে,
নিজেদের ভেতরের দিকে।
বেশ কিছু পরিচিত মুখ পাশ কাটিয়ে চলে গেল—
“দাদা, যাচ্ছেন?”
“রুট–মার্চ করছি, বাড়ি–বাজার–পুজোর জিনিস সব একসঙ্গে!”
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করল না,
“দাদা, আপনি আর অনিন্দিতা একসঙ্গে কোথায় যাচ্ছেন?”

তারা ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। বিকেলের রোদ হালকা, গাছের পাতার ওপর দিয়ে পড়ে ছায়া–আলো তৈরি করছে। রাস্তার ধারের এক দোকানে “সিঙ্গারা–চা” লেখা বোর্ড, তার পাশেই একটা ছোট ক্যাফে—কাচের ভেতরে আলো ঢিমে, কয়েকটা টেবিল খালি।
অরিন্দম থেমে বলল,
“ওদিকটা?”
অনিন্দিতা হেসে বলল,
“দেখে–শুনে জায়গা বাছছেন দেখছি। চায়ের দোকান নয়, ক্যাফে—ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড–ট্র্যাকের পার্থক্য আছে।”

দু’জন ভেতরে ঢুকল। হালকা মিউজিক বাজছে, খুব জোরে নয়। কোণে একটা টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল তারা।
ওয়েটার এসে অর্ডার নিল—
“দুই কাপ চা, দুধ–চিনি আলাদা।”—অনিন্দিতা বলল।
“তুমি কীভাবে জানলে?”—অরিন্দম একটু অবাক। অনিন্দিতা মুচকি হেসে বলল,
HR–এর কাজই তো দেখো—কে কেমন করে চা খায়, কে টিফিনে কী আনছে, কতক্ষণে মাথা ধরে গেলে চায়ের দরকার হয়—এসব ছোটখাটো তথ্যই তো পরে হয়ে যায় মানুষের মানচিত্র।”

একটু থেমে চায়ের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
“দিল্লিতে যখন ক্লায়েন্ট–দের ফাইল সামলাতাম, সেখানেও এভাবেই দেখতাম—কে রাতের ফ্লাইটে এসে শুধু ব্ল্যাক কফি খাচ্ছে, কে মিটিং শেষে নিঃশব্দে দ্বিতীয় কাপ চা নেয়। তখনও জানতাম না, একদিন ঠিক সেই তথ্যগুলো নিয়েই আমি এই কলকাতার অফিসে বসব… আর আপনি সামনে বসে থাকবেন।”

ক্রমশঃ

1 thought on “লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৩”

Leave a Reply to ariroy Cancel Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top