লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৪

অরিন্দমের হঠাৎ মনে পড়ে গেল—এই মেয়েটাকে সে প্রথম দেখেছিল কলকাতায় নয়, সেই ধোঁয়ায় ধোঁয়া দিল্লির আকাশের নিচে; দিল্লির আকাশে সেদিনও ধোঁয়া ভাসছিল, কিন্তু কনফারেন্স–রুমের কাচের ভেতরে সবকিছুই ছিল ধোপদুরস্ত—গ্লাস–টপ টেবিল, প্রজেক্টরের আলো, আর ভদ্র গলায় বলা ডেডলাইন–এর হুমকি।

সেদিন অরিন্দম ফ্লাইটের ক্লান্তি চোখ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখনই দরজাটা হালকা শব্দ করে খুলল।
হাতে ল্যাপটপ, গলায় আইডি–কার্ড, চোখে এক ধরনের অদ্ভুত স্থিরতা নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল মেয়েটা—
“গুড ইভনিং, আই এম অনিন্দিতা সেন।”

সে ঐ পরিচিত কর্পোরেট ভঙ্গিতেই কথা বলছিল, কিন্তু তার চলাফেরায় একটা অন্যরকম নিশ্চিন্ত ভাব ছিল—
যেন ঘর ভর্তি সিনিয়র, ক্লায়েন্ট, ম্যানেজার—কেউ তাকে বিশেষ ভয় দেখাতে পারবে না, বরং তাদের অগোছালো কথা, নোট, ডেটা–সবকিছুকে সে ঠিকঠাক গুছিয়ে দিতে পারবে।
অরিন্দম খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে শুধু “একজন দক্ষ কো–অর্ডিনেটর” দেখেছিল—
ডেডলাইন শুনে মুখ সোজা,
অযৌক্তিক প্রেশারে মুচকি হাসি,
ক্লায়েন্টের বাড়াবাড়ি কথা শুনে কেবল কলমের ডগাটা একটু থেমে যাওয়া।
কয়েকটা ট্রিপের মধ্যে তিনটে জিনিস তার মাথায় পিনের মতো গেঁথে গেছিলঃ
এই মেয়েটা সবসময় সবার আগে কনফারেন্স–রুমে ঢোকে,
সবশেষে বেরোয়,
আর মাঝের সময়গুলোতে কাউকে ইমপ্রেস করার চেয়ে কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, সেটাতেই তার বেশি আগ্রহ।

একটা সন্ধ্যায়, খুব চাপের মিটিং শেষ হওয়ার পর লিফটে দু’জন হঠাৎ একসঙ্গে পড়েছিল।
দিল্লির উষ্ণ বাতাস দরজার ওপারে, ভেতরে এ–সি–র ঠান্ডা।
তাদের মাঝে শুধু কয়েকটা আলো জ্বলা বোতাম।
অরিন্দম হালকা কথা বলতে চেয়েছিল,
“দিল্লি বেশ মানিয়ে নিয়েছে আপনাকে।”
অনিন্দিতা একটু হেসেছিল,
“দিল্লি মানিয়ে নিয়েছে, আমি পারিনি এখনও। আমার শহরটা তো অন্য—কলকাতা।”
“তাহলে থেকে গেছেন কেন?”
“প্রথমে চাকরি, পরে দায়িত্ব, তার পরে টাকা। এই তিনটে জিনিস মানুষকে শহর ছাড়তে দেয় না, আবার শহরে রাখতেও পারে না,”—সে কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল, “তাই মাঝে–মাঝে ভাবি, একদিন সব ছেড়ে আবার ফিরে যাব।”
এই “ফিরে যাব” শব্দটা অরিন্দমের মাথায় সেদিন থেকে কোথাও লেগে রইল।

ফোনকল, যেখানে প্রথম ফাটল ধরা পড়ে

কয়েক মাস পরে, কলকাতা অফিস থেকে এক বিকেলে সে দিল্লির ওই ক্লায়েন্ট–অফিসে কল করেছিল রিপোর্টের জন্য।
অন্য প্রান্তে ফোন তুলল অনিন্দিতা।
স্বাভাবিক কাজের কথা, ডেটা, মেইল—সব বলার পর অজান্তেই বেরিয়ে গেল প্রশ্নটা,
“কেমন আছো?”
হঠাৎ “আপনি” থেকে “তুমি”–তে সরে আসার সেই অচেতন মুহূর্তটা নিজেই টের পেল অরিন্দম; কথাটা বেরিয়ে যাওয়ার পর এক সেকেন্ডের নীরবতায় সে যেন নিজের কণ্ঠস্বরকেই নতুন করে চিনে নিল।  ওপাশে এক সেকেন্ডের নীরবতা, তারপর ছোট্ট হাসি,
“কর্পোরেট উত্তর দেব, না সত্যি? কর্পোরেট উত্তর—আই এম ফাইন। সত্যি উত্তর—দিল্লি আর ভালো লাগছে না।”

অরিন্দম অবাক,
“হঠাৎ?”
“হঠাৎ না। অনেকদিনের জমে থাকা ক্লান্তি,”—অনিন্দিতা বলল, “বাবা–মা কলকাতায়, আমি এখানে। একা ঘরে ফিরে মনে হয়, শহরটা শুধু আমার কাজের জন্য। নিজের জন্য একটা কাপ চাও ঠিকঠাক লাগে না। জানেন, মাঝে–মাঝে মনে হয়, যদি আবার কলকাতায় ফিরতে পারতাম…”
ওই “আবার কলকাতায়”–র ভেতরে এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ছিল।

এবার অরিন্দমের মাথায় যা অনেক দিন ধরে ঢুকেও ঢুকছিল না, হঠাৎ পরিষ্কার হলো।
“কলকাতায় ফিরতে চাইছ?”—সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,”—ওপাশের উত্তর এবার বিনা দ্বিধায়, “অন্তত এই শহর আর চাই না। আমার শহর আমাকে ফিরিয়ে নিক, সেটাই চাই।”
এই জায়গাতেই সে নিজের সীমা আর দায়িত্বের মাঝের পাতলা রেখাটাকে একটু ঠেলে দিল।
“একটা কথা বলি? আমাদের অফিসে মাঝে–মাঝে HR, ক্লায়েন্ট–হ্যান্ডলিং, প্রোজেক্ট কো–অর্ডিনেশনের জন্য মানুষ লাগে।  তুমি যদি সত্যিই ফিরতে চাও, আমি তোমার নামটা আমাদের HR–কে বলতে পারি। সিদ্ধান্ত ওদের–ই। আমি শুধু দরজা দেখাতে পারি।”
মুখে খুব কুল, ভদ্র, “প্রফেশনাল” কথা—
ভেতরে কিন্তু এই প্রথম সে “তুমি” আর “আপনি”–র মাঝ বরাবর কাঁপছে।|
ওপাশে আবার নীরবতা।
একটা চেয়ারের ঘষটে যাওয়ার শব্দ, জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়ানোর আওয়াজ যেন কানে এলো।

“আপনি… এটা সত্যিই বলছেন?”—অনিন্দিতার গলায় এইবার স্পষ্ট ঝাঁকুনি, আনন্দ আর অবিশ্বাস মেশানো।
“আমি শুধু এতটাই বলতে পারি,”—অরিন্দম গলা স্থির রাখার চেষ্টা করল, “তোমার কাজ আমি দেখেছি। দিল্লির ওই কনফারেন্স–রুমে তুমি যতবার আমাদের মিটিং বাঁচিয়েছ, আমার মনে হয়েছে—তুমি শুধু ক্লায়েন্ট–এর জন্য না, যেকোনো অফিসের জন্য সম্পদ। বাকি যা হবে, HR ঠিক করবে। আমি কেবল বলব—‘এই মেয়েটাকে একবার দেখে নিন।’”

ফোনের ওপারের নিঃশ্বাস একটু ভারী হলো।
“অনেকদিন পরে মনে হচ্ছে, কেউ আমাকে শুধু ‘রিসোর্স’ বলে দেখল না,”—অনিন্দিতা ধীরে বলল, “দেখুক, কি হয়। আমি সিভি পাঠাচ্ছি।”
ফোন কেটে গেলে কয়েক সেকেন্ড ধরে মোবাইলটা হাতে নিয়েই বসে রইল অরিন্দম।

কয়েক মাস পর, কলকাতার অফিসের লিফটে দাঁড়িয়ে HR–এর কল পেল সে।
“অরিন্দমদা, আজ যে ক্যান্ডিডেটটা এসেছে, অনিন্দিতা সেন—দিল্লি থেকে এসেছে।  আপনার নামও দিয়েছে রেফারেন্সে। একটু প্যানেলে বসতে পারবেন?”
লিফটের দরজা খুলে গেল, করিডোরের সাদা আলো চোখে পড়ল।
দূরে রিসেপশনের পাশে বসে আছে একজন মেয়ে—ফর্ম ভর্তি করছে, সিভি হাতে, চুল বাধা, চোখে ক্লান্ত অথচ তীক্ষ্ণ সেই একই স্থিরতা।
এই কয়েক সেকেন্ডে অরিন্দমের মনে ঠাস করে উঠে এলো সব–
দিল্লির সেই প্রথম কনফারেন্স–রুম,
লিফটে বলা “আমার শহরটা অন্য—কলকাতা”,
ফোনে ঝাপসা কণ্ঠে বলা “দিল্লি আর ভালো লাগছে না”,

আর আজকের এই বাস্তব—

সে সত্যিই এসেছে,
তার শহরে,
তার অফিসে,
তার তৈরি করা দরজা দিয়ে।
নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নরম গলায় শুধু একটাই কথা বলেছিল সে,
“ওকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।”

ক্যাফেতে —কাচের ভেতরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল দু’জনে। বাইরে গাড়ি যাচ্ছে, ভিতরে কাপের শব্দ, মিউজিকের মৃদু ঝংকার।
অরিন্দম প্রথমে কাজের কথা তুলতে গেল,
“এই প্রজেক্টটা শেষ হলে—”
নিজেই থামল। মনে পড়ল—শর্ত আছে, “ম্যানেজার–HR” কথা নয়।
সে ভঙ্গি বদলে বলল,
“তুমি দিল্লিতে কতদিন…?”
“তিন বছর,”—অনিন্দিতা কাপের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তার আগে অন্য শহরে, আর তার আগেও অন্য। আসলে ভাবলে দেখি, আমার পুরো জীবনের ঠিকানা–টাই যেন বড় একটা ‘ক্যারেক্টার মুভমেন্ট’—শহর বদলেছে, চাকরি বদলেছে, রুম বদলেছে; একটাই পরিবর্তন হয়নি—একাকীত্ব।”

“পরিবার?”

“আছে,”—সে গম্ভীর গলায় বলল, “বাবা–মা আছে, ছোট্ট একটা পুরোনো বাড়ি আছে শুধুই, সেই বাড়িতে আমি আর থাকি না—থাকি ওই ভাড়া–ঘরে। বাবা এখন অসুস্থ, মা একা সামলাচ্ছে। আমি দূরে থেকে টাকা পাঠাই, ফোনে কথা বলি—এটাই এখনকার ‘কর্তব্য’। কাছাকাছি থাকলে এই কাজটা শেষ পর্যন্ত করতেও পারতাম না।”
অরিন্দম চুপ করে শুনছিল।
“তুমি কি কখনো কাউকে বলো এসব?”
“এখন বলছি তো,”—অনিন্দিতা হাসল, “আজকের এই চা–টা একটু অন্যরকম। সাধারণত আমি শুধু শুনি, আজ মনে হচ্ছে একটু বলতে চাই।”
কথাটা শুনেই অরিন্দমের ভেতরে কিছু একটা আলগা হয়ে গেল।
সে নিজে থেকে বলল,
“জানো, বিয়ে হওয়ার আগে আমি ঠিক করেছিলাম— আমি বিয়ে করবো না কখনোই।” অনিন্দিতা মাথা তুলল,

“তারপর?”

ক্রমশঃ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top