লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৮

এই সময়েই তার কর্মজীবনও ধীরে ধীরে স্থির এবং দৃঢ় হতে শুরু করল। অফিসে প্রথমদিকে সে শুধুই ছোটখাটো কাজ করত—কাগজপত্র সাজানো, ফাইল আনা–নেওয়া, সবার কথা মনে রেখে সময়মতো নথিপত্র জমা দেওয়া—তার কাজ নির্ভরযোগ্য ছিল, চোখে না পড়ার মতো হলেও কার্যকর। ধীরে ধীরে সহকর্মীরা বুঝতে শুরু করল, এই চুপচাপ মানুষটার ওপর ভরসা করা যায়। পদোন্নতি না পেলেও সে সম্মান পেল; ম্যানেজার বলতো, “ওকে বললে কাজটা ঠিকঠাক হবে।” বেতনের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও কাজের ভিত মজবুত হলো, নিজের অবস্থান সম্পর্কে অরিন্দমের ভেতরে নির্ভরতার অনুভূতি জন্ম নিতে লাগল।

তার জীবনের প্রতিটি দিকে যেন একটু একটু করে শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল। সকালে নির্দিষ্ট সময়ে বেরোনো, অফিসের কাজের মাঝে মাঝে ছোট ছোট সাফল্য, বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে দু’মিনিট কথা বলা, সুতপার হাসি, জয়ন্তের সঙ্গে কখনো কখনো ফোনে আড্ডা—সব মিলিয়ে দিনগুলো এক সুতোয় গাঁথা যেতে লাগল। যে জীবনে এতদিন শুধু সংগ্রাম আর লড়াইয়ের শব্দ ছিল, সেখানে এখন দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হলো স্বাভাবিকতার এক মৃদু সুর।

এভাবেই অরিন্দমের জীবন প্রথমবারের মতো শান্ত নদীর মতো বইতে শুরু করল—কোনো বড় ঢেউ নেই, কোনো তীব্র উত্তেজনা নেই, কোনো আকস্মিক ঝড় নেই। শুধু প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্ব, নিয়মিত পরিশ্রম, পরিবারের তিনজন মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসা, আর মানুষের ভরসায় বোনা একটি সংসারের শুরু। তার ভেতরের পুরোনো কষ্টগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি, বাবার স্মৃতি এখনো তাকে মাঝেমাঝে বিষণ্ন করে, কিন্তু সেই সবকিছুর মাঝেও সে বুঝে গেছে—এবার নদীটা শুধুই পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে এগোবে না, কোথাও না কোথাও সমতল জায়গা পেয়েছে, যেখানে অন্তত কিছুটা সময় শ্বাস নিয়ে সামনে তাকানো যায়। এই বিনীত, অগোচরে বদলে যাওয়া জীবনই অরিন্দমের সত্যিকারের জয়—যা হয়তো কোনো আড়ম্বরের আলো দাবী করে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে দৃঢ় করে, স্থির করে, আর নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

অনিন্দিতা হঠাৎ কাঁধ সোজা করে অরিন্দমের দিকে তাকাল।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”—গলাটা খুব আস্তে।

অনিন্দিতা প্রশ্নটা করতে গিয়ে নিজেই এক মুহূর্ত থমকে গেল।
“মানে… এই যে এত দায়িত্ব, এত ক্লান্তি, এত ভয়—এসব তো একদিনে আসেনি। যখন শুধু আপনারা দুজন ছিলেন, অলোক আসার আগে… তখন কেমন ছিল আপনাদের সংসার?”—বলার পরে তার ভেতরে হালকা একটা খোঁচা লাগল—এটা কি জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল?

সে জানে, একজন বিবাহিত পুরুষের বিয়ের প্রথম দিকের সুখ–দুঃখ, ঘনিষ্ঠতার গল্প শোনার ইচ্ছে নিজের জায়গা থেকে খুব স্বাভাবিক; তবু এই প্রশ্নের ভেতরে এমন এক ব্যক্তিগত দরজা রয়েছে, যেখানে ঢোকা মানে সেই সংসারের গোপন জায়গায় পা রাখা। ঠিক এই দ্বন্দ্বটাই তাকে অস্বস্তি আর কৌতূহলের মাঝামাঝি ঝুলিয়ে রাখল—একদিকে মানুষটাকে সত্যিকারে জানতে চাওয়ার ইচ্ছে, অন্যদিকে সীমারেখা লঙ্ঘন করে ফেলছি কি না, এই অস্বস্তি।

বিয়ের পর প্রথম দুটো বছর অরিন্দমের জীবনে যেন নতুন এক ভোর নেমে এল। এতদিন যার জন্য সংসার মানেই ছিল ঘামে ভেজা বাবার ফেরা, মায়ের ক্লান্ত মুখ আর হিসেবি রাতগুলো, সেই ছেলেটা এবার নিজে একটি ছোট্ট সংসারের পুরুষ হয়ে উঠেছে—এই ভাবনাটাই তাকে মাঝেমধ্যে অবাক করে দিত। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাস্তার লাইট পোস্টগুলো যখন একে একে আলো জ্বালত, অরিন্দমের মনে তখন এক অদ্ভুত নিশ্চিন্তি কাজ করত—ওই আলো পেরিয়ে গিয়ে একটা ঘর আছে, যেখানে দুজন মানুষ তার অপেক্ষায় থাকে।

সুতপা এই দুই বছরে ঘরটাকে এমনভাবে গুছিয়ে নিয়েছে, যেন বহুদিন ধরেই সে এই দায়িত্বের অপেক্ষায় ছিল। সকালে অরিন্দম বেরোনোর আগে তার জামা, ব্যাগ, টিফিন, চায়ের কাপ—সবকিছু এমনভাবে প্রস্তুত থাকত, যেন কোনো অদৃশ্য স্ক্রিপ্ট মেনে প্রতিটা কাজ চলে। নীলিমা প্রথম প্রথম অবাক হয়ে দেখতেন—আলমারি, রান্নাঘরের মশলার বোতল, চাল–ডালের ডিব্বা, এমনকি বসার ঘরের পর্দা আর কুশনের কাভার—সবকিছু আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে, কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা বাড়াবাড়ি নেই।

সুতপার পুজোপাঠে খুব ভক্তি। সকালবেলা সে উঠে স্নান সেরে ঠাকুরঘরের সামনে বসে পড়ত। মৃদু গলায় মন্ত্র পড়া, ধূপকাঠি জ্বালানো, ফুল সাজানো—এসব কাজ সে এমন এক একাগ্রতায় করত, যা অরিন্দমকে প্রথম দিকে অবাক করত। তার কাছে ধর্ম মানে ছিল বেশি করে একটা অভ্যাস, ছোটবেলা থেকে দেখা কিছু রীতি; কিন্তু সুতপার কাছে পুজো যেন একান্ত ব্যক্তিগত কথা বলা—এক নির্ভরতার জায়গা, যেখানে সে নিজের অদেখা ভয়, ছোট্ট ছোট্ট খুশি আর অপ্রকাশিত ইচ্ছে সব গুছিয়ে রাখে।

দাম্পত্য জীবনে রোমান্স বলতে যে সিনেমার মতো হাত ধরা, চুপিচুপি ঘুরতে যাওয়া, কিংবা রাত জেগে আড্ডা—এসব বলে যে কিছু আছে, সুতপার কাছে সেই ধারণা খুব স্পষ্ট ছিল না। বিয়ের আগে তার জীবন গেছে মধ্যবিত্ত এক পরিবারে, যেখানে মেয়েদের “ভালো বউ” হওয়ার পাঠই বেশি দেওয়া হয়েছে—স্বামীকে সময়মতো খাওয়ানো, শাশুড়ির ওষুধ খেয়েছে কিনা দেখা, ঘরকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখা, পাড়ার লোকের সামনে সম্মান বজায় রাখা। ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা, স্বপ্নবিলাস—এসব তার কল্পনায় ছিল, কিন্তু সেগুলোকে কখন কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সে শিক্ষা কেউ তাকে আলাদা করে দেয়নি।

তবু, সুতপা শাশুড়ি আর স্বামীর প্রতি ছিলেন অসম্ভব যত্নশীল। নীলিমার মাথাব্যথা উঠলে সে আঙুল দিয়ে কপালে হালকা মালিশ করত; শীতের রাতে কম্বলের এক কোণা ঠিকঠাক আছে কিনা বারবার দেখে নিত। অরিন্দম অফিস থেকে ফিরলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত, হাতে কাপে করে গরম চা, মুখে নরম হাসি। “আজ খুব কষ্ট হলো?”—এমন সরল প্রশ্নের মধ্যে যতটুকু উদ্বেগ আর স্নেহ ঢোকানো যায়, সে তা পুরো চেষ্টা করেই ঢোকাতো।

নিজের শখ আহ্লাদ অবশ্য তারও ছিল। নতুন শাড়ি দেখলে তার চোখে একটু বাড়তি আলো ফুটে উঠত, টিভিতে কোনো সুন্দর শাড়ি বা গয়না দেখতে পেলেই মনে মনে ভাবত, “কী সুন্দর!” পুজোর সময় নতুন ব্লাউজের ডিজাইন, সুন্দর শাঁখা–পলাতে হাত সাজানো, একদিন শহরের ভালো দোকানে গিয়ে আড়চোখে একটু দেখে আসা—এসব ছোট্ট ইচ্ছে গুলো তার ভেতরে নদীর স্রোতের মতো নীরবে বইত। কিন্তু সে এসব কখনো অরিন্দমকে বলত না।

বলার সময় এলে তার মাথায় আগে চলে আসত অরিন্দমের ক্লান্ত মুখ, মাসের বাজেট, বাকি থাকা বিল, মায়ের ওষুধ—আর তখন সে নিজের ইচ্ছে গুলোকে খুব সহজে সরিয়ে রাখত। “থাক, থাক, এটাই বা এত জরুরি কী?”—এই ভাবনা তার অনেক শখের ওপর ঢাকনা হয়ে বসে থাকত। নীলিমা মাঝে মাঝে বুঝে ফেলতেন মেয়ের মনের হাল, নরম গলায় বলতেন,
“তুই তো মাঝে মাঝে শাড়ি–টাড়ি কিনতে চাইতে পারিস?”
সুতপা হাসত, চোখ নামিয়ে বলত,
“সবই তো আছে মা। ওই যে রঙটা, গতবারের পুজোয় কিনেছিলাম… এখনও তো ভালোই আছে।”
এই “সবই তো আছে” কথার ভেতরেই লুকিয়ে থাকত না পাওয়া অনেক কিছু। অরিন্দম তার এই না–বলা ইচ্ছেগুলো একটু একটু করে বুঝতে শিখেছিল। রাতে খাওয়ার পর যখন সুতপা থালা ধুচ্ছে, কিংবা শুকনো কাপড় ভাঁজ করছে, তখন সে লক্ষ্য করত—সুতপার চোখ কখনো টিভিতে চলা কোনো সিরিয়ালের সাজ–গোজের দিকে একটু বেশি স্থির হয়ে থাকে, কিংবা পাড়ার কারও নতুন শাড়ি দেখে সে একমুহূর্ত নিঃশব্দ হয়ে যায়। অরিন্দম সেই নিঃশব্দতার ভাষা ধরতে পারত; সে জানত, সুতপা চাইছে, কিন্তু চাওয়ার অভ্যাস তার নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top