পার্কের ভেতরে, কথার ঘনতা
পার্কের ভেতরে ঢুকতেই বাইরের রাস্তার শব্দ একটু দূরে সরে গেল।
গাছের তলায় কয়েকটি বাচ্চা লুকোচুরি খেলছে,
দু’পাশে দুই বৃদ্ধ পত্রিকা নিয়ে বসে, কেউবা হাঁটছেন ধীরে–ধীরে,
এক কোণে একটি কিশোরী কানের হেডফোন পরে নাচের স্টেপ প্র্যাকটিস করছে।
অরিন্দম আর অনিন্দিতা গিয়ে বসল একটি পুরোনো বেঞ্চে—আধেক–রং উঠে গেছে, তবু শক্ত।
“আপনি যদি এখন কোনো গল্পের চরিত্র হন,”—অনিন্দিতা হালকা হাসি নিয়ে বলল, “তাহলে এই ছবিটা কেমন লেখা হবে?”
অরিন্দম একটু ভেবে বলল,
“‘চল্লিশ–ছুঁইছুঁই এক অফিস–ম্যানেজার, যার গায়ে ফরমাল শার্ট, হাতে ঘড়ি—একটা বিধানসভা–রিপোর্ট টাইপ গাম্ভীর্য নিয়ে বসে আছে পার্কের বেঞ্চে। পাশে বসে আছে HR–এর একজন সুন্দরী মেয়ে, যার চুলে বাতাস লাগলে অফিসের জানালা নয়, আকাশের নীল রঙ বদলে যায়।’ এইরকম?”
অনিন্দিতা মুচকি হাঁসল।
“আপনার বর্ণনায় নিজেকে সুন্দর লাগল। তবে আপনার নিজের কথা?”
অরিন্দম আকাশের দিকে তাকাল।
“আমার নিজের কথা?”—কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমার তো সবসময় নিজেকে মনে হয়—দুই প্রান্তের মাঝখানে আটকে থাকা একটা ব্রিজ। একদিকে আমার মা–বউ–ছেলে, আরেকদিকে আমার কোম্পানি–ক্লায়েন্ট–টিম। আমার কাজ শুধু সবাইকে পার করিয়ে দেওয়া। ব্রিজের নিজের কোনো গন্তব্য থাকে?”
অরিন্দম একটু হেসে বললো আমার নিজের কথা শুনতে হলে অনেকটা পথ পেছনে যেতে হবে— বীরভূমের সেই ছোট্ট পাড়া, কুয়াশা–ঢাকা ভোর, আমার বাবার হার মানা চোখ, মায়ের সাদা থালা… সব দেখতে হবে। সে গল্প একদিন শোনাবো”
অনিন্দিতা মাথা নাড়ে, চোখ সরায় না।
“না, আজই বলুন,”—সে আস্তে বলল, “আজ আমি শুধু শ্রোতা হতে এসেছি। আজ যদি না শোনান আপনি আবার শক্ত হয়ে যাবেন। আজ আপনার ছোটবেলাটাও শুনি।”
বীরভূমের এক ছোট্ট পাড়ায় অরিন্দম রায়ের শৈশব কাটে। পাড়াটা খুব বড় নয়, তবু অদ্ভুতভাবে ভরা গল্পে—সকালের কুয়াশার চাদরে ঢাকা গলি, দুপুরের শোরগোল আর সন্ধ্যার নেমে আসা নীরবতা মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য বই, যেখানে প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয় জীবন আর সংগ্রামের পাতা। এই নীরবতার ভিতরেই অরিন্দম বড় হয়ে উঠেছিল—বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ এক ছেলেবেলা, ভেতরে অথচ দুলতে থাকা দারিদ্র্য, দায়িত্ব আর স্বপ্নের টানাপোড়েন। একদিকে সংসারের দুঃশ্চিন্তা তাকে বারবার বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনত, অন্যদিকে নিজের স্বপ্নের মুখোমুখি হওয়ার যন্ত্রণা তাকে ঠেলে দিত আরও দূরের দিকে, যেখানে হয়তো একদিন তার লেখা আর তার জীবন—দুটোই নতুন মানে খুঁজে পাবে।
অরিন্দমের বাবা পীযুষ রায় হোটেলে কাজ করতেন। শহরের এক মাঝারি মানের হোটেলে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা, প্লেট–গ্লাস তোলা–নামানো, অর্ডার নেওয়া, রান্নাঘরের ধোঁয়া আর তাপে দম বন্ধ হয়ে আসা—সবই তাঁর প্রতিদিনের জীবনের এমন অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল, যেন এগুলো বাদ দিলে তাঁর পরিচয়টাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টেবিলের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটাহাঁটি, গ্রাহকের ভালো–মন্দ মেজাজ সামলানো, কখনো অন্যের রাগের লক্ষ্য হয়ে থাকা—এসব কিছুর মাঝেও তিনি নিজেকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন না; যেন এটাই স্বাভাবিক, এটাই হওয়ার কথা। রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে জুতোটা ক্যাঁক ক্যাঁক করে উঠত প্রতিটা ধাপে, আর সেই শব্দ অরিন্দম দূর থেকেই চিনে ফেলত। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকা মানুষটার চোখে থাকত জমে ওঠা ক্লান্তি, শরীরে থাকত থকথকে পরিশ্রমের চিহ্ন, কিন্তু মুখে থাকত এক টুকরো মোলায়েম হাসি—সেটুকুই যেন তাঁর একমাত্র বিলাস। নিজের দুঃখ–ক্লান্তি তিনি কখনো সন্তানকে বোঝাতে চাননি; কষ্ট যেন কেবল তাঁর শরীর আর মনের ভেতর ঘুরপাক খায়, বাইরে এসে ছেলের চোখে না-পড়ে—এই ছিল তাঁর এক নীরব জেদ।
অরিন্দম ছোট থেকেই দেখেছে—বাবা বেশি কিছু বলতে ভালোবাসতেন না। বাড়িতে ফিরে চুপচাপ গামছা দিয়ে মুখ মুছতেন, তারপর গা ধুয়ে সামান্য খাবার খেয়ে এক কোণে বসে থাকতেন, যেন দিনভরের সব শব্দ আর আওয়াজ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে নিজের ভেতরের নীরবতার কাছে ফিরে যাচ্ছেন। যা বলতেন, তা খুব ধীরে, খুব সাধারণ সুরে, যেন কথার চেয়ে ওই সুরটাই বেশি দরকারি। মা কখনো কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন, “তুমি সারাদিন কী করো, কিছুই তো বলো না আমাদের!” পীযুষ মৃদু হেসে বলতেন, “এত কথা শুনি যে সারাদিন, বাড়িতে এসে শুধু তোমাদের মুখটাই দেখতে ভালো লাগে।” অরিন্দম এসব দৃশ্য দেখে বড় হয়েছে—কম কথার মানুষ, কিন্তু কথার ভেতর অদৃশ্য একটা শক্তি।
একদিন সন্ধ্যেয়, যখন আকাশের আলো ঠান্ডা হলুদ হয়ে এসেছে, পাড়ার গলিতে আলো–আঁধারির খেলা, আর দূরে কোথাও মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে, তখন পীযুষ বারান্দায় বসে ছিলেন। অরিন্দম পাশেই মাটিতে পা ছড়িয়ে খাতায় কিছু লিখছিল, কিন্তু মন ছিল অন্য কোথাও। মাঝে মাঝেই তার চোখ চলে যাচ্ছিল বাবার দিকে। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর অসুস্থতার ছাপ ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল পীযুষের শরীরে—কাঁধটা আগের মতো সোজা থাকে না, হাঁটাও একটু ধীর। সেই সময়েই হঠাৎ তিনি ধীরে বলে উঠলেন,
“কষ্ট কোনোদিন শেষ হয় না রে অরি, তবে মানুষ যদি মাথা নত না করে, কষ্টও পথ দেয়।”
কথাটা তিনি বললেন এমন সহজভাবে, যেন এও একটা স্বাভাবিক তথ্য, তবু সেই সরল বাক্যের ভেতর অদ্ভুত ভার ছিল। অরিন্দম অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, বুঝতে পারল না কী উত্তর দেবে। কিন্তু সেই কথাটা তখন থেকে তার মনে এক ফোঁটা শব্দের মতো পড়ে রইল, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢেউ তুলতে লাগল। বছর কেটে গেলেও, যখনই বড় কোনো দুঃসময় কিংবা ভাঙা মনোবলের সামনে নিজেকে একা মনে হয়েছে, বাবার সেই গলার আওয়াজ যেন ভেসে উঠেছে—মাথা নত করা যাবে না, কষ্টকে পার হয়ে যেতে হবে।
মা নীলিমা রায়, সংসারের আসল মেরুদণ্ড। পীযুষের আয় অল্প, কখনো নিয়মিত, কখনো অনিয়মিত; তার ওপর ক্রমে বাড়তে থাকা অসুস্থতা—খাবারে কাটছাঁট, ওষুধের টান, মাঝেমধ্যে কাজে ছুটি নিতে হওয়া—সব মিলিয়ে সংসারের হিসেবটা কখনোই সহজ ছিল না। তবু নীলিমা কোনোদিন উচ্চ স্বরে অভিযোগ করেননি। তিনি হাঁটছিলেন এক সরু সেতুর ওপর—একদিকে অভাব, অন্যদিকে সম্মান আর আত্মসম্মান; মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিদিনই ব্যালান্স করতেন। পরিবারের প্রতিটি বিষয়ে নীলিমার ধৈর্য আর শান্তির পরশ থাকত। বাজার করতে যাওয়া থেকে শুরু করে রান্না, ছেলের পড়াশোনা, স্বামীর যত্ন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য—সব কিছুর মধ্যে তিনি এক ধরনের নীরব শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন, যেন বিশৃঙ্খলার মধ্যেও একটা সুতো সবকিছু ধরে রেখেছে। রাতে তিনি অরিন্দমকে গল্প শোনাতেন। সেই গল্পগুলো কোনো রাজপাটের, অতিরঞ্জিত পরীর দেশের বা দুর্দান্ত বীরের ছিল না। নীলিমার গল্পে থাকত সাধারণ মানুষ—কোনো মেয়ের নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা শেষ করা, কোনো ছেলের ছোট ব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো, কোনো মায়ের একা হাতে সন্তান মানুষ করা, কিংবা কোনো শ্রমিকের শরীর–ভাঙা পরিশ্রমের মাঝেও বেঁচে থাকার জেদ। যেন গল্প মানে শুধু বিনোদন নয়; জীবনকে ধরা, বোঝা, আর টের পাওয়া। তিনি যেন অরিন্দমকে নিজের অজান্তেই বুঝিয়ে দিতেন—বাঁচতে হলে মনের ভেতর আলো রাখতে হয়, আর সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্বও নিজেরই। বাইরে কতটা অন্ধকার তা দিয়ে জীবনের মান ঠিক হয় না, ভেতরের আলোই ঠিক করে দেয় সে অন্ধকারের সঙ্গে কার মতো লড়াই করবে।
ক্রমশঃ…


