লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৫

অনিন্দিতা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
“আপনি আপনার ছেলের কথা বলছিলেন…”
“হ্যাঁ, অলোক।”

তার গলায় নরম সুর।
“ওকে রেখে আপনি আজ এখানে?”—প্রশ্নটা খুব নিঃসন্দেহ, আবার একেবারে নিরীহ।
অরিন্দম একটু থমকাল, তারপর স্বীকার করল,
“বিশ্বাস করবে? আমি নিজেও আজ নিজের কাছে এই প্রশ্নটা করেছি। তারপর ভাবলাম—এতদিন নিজেকে কখনো কোথাও বসাইনি। আজ আধঘণ্টা যদি নিজের সঙ্গে বসি, সেটা কি এত অপরাধ?”
অনিন্দিতা চোখ সরিয়ে নিল না।
“তাহলে এই আধঘণ্টা নিজের সঙ্গে বসা—তার মধ্যে আমি কোথায়?”

কথাটা শুনে প্রথমবারের মতো অরিন্দমকে সত্যি উত্তর দিতে হলো,
“তুমি?”—সে একটু থামল, “তুমি হয়তো সেই আয়নাটা, যেখানে আমি দেখতে পারছি—আমি কতটা ক্লান্ত। বাড়িতে কেউ দেখে না, অফিসে কেউ দেখে না—তুমি দেখেছো। তাই”
এই এক কথায়, এই এক বিকেলে, তারা দু’জন বুঝে গেল—
এটা স্রেফ একটা হাফ–ডে–র চা নয়।

চা ঠান্ডা হয়ে এলেও টেবিলের ওপর কথাগুলো তখনও গরম।
অরিন্দম কাপটা নামিয়ে রাখল। ভেতরে কোথাও অনুভব করল—এত খোলামেলা, সরাসরি নিজের কথা সে শেষ কবে বলেছিল, স্মরণ করতে পারছে না।
অনিন্দিতা কাপের ভিতরের শেষ চুমুকটা নিয়ে বলল,
“আপনি জানেন, আপনি খুব কম কথা বলেন। কিন্তু যখন বলেন, তখন কথাগুলো যেন খুব পুরোনো—অনেকদিন ধরে জমে থাকা।”
অরিন্দম একটু হেসে বলল,
“তুমি তো দেখেছো, আমার কাজ করার স্টাইল—কম কথা, বেশি দায়িত্ব।”
“আর বেশি চাপ,”—অনিন্দিতা যোগ করল।
বাইরের আলো কিছুটা নরম হয়েছে, কাচের বাইরে গাছের পাতায় রোদের কণা আর নেই, শুধু হালকা হলদে আভা।

“চলো?”—অরিন্দম বলল।
“চলুন। তবে অফিস–এর দিকে নয়, একটু ঘুরে গিয়ে ফিরি?”
প্রস্তাবটা অনিন্দিতা করল, কিন্তু আসলে এটা দুজনেরই মনের কথা।

ছোট্ট রাস্তা, একটু আলাদা হাওয়া

ক্যাফে থেকে বেরিয়ে তারা এমন দিকে হাঁটতে শুরু করল, যেদিকে সাধারণত কেউ যাওয়ার কথা ভাবে না—অফিস–বাস–স্ট্যান্ড নয়, পার্ক–মুখী সরু রাস্তা। দু’ধারে পুরোনো গাছ, মাঝেমাঝে তিন–চারতলা বাড়ির বারান্দায় ভেজা কাপড়, গাছের টব, কোথাও পাখির খাঁচা ঝুলছে।
মোড় ঘোরার সাথে সাথে ডানদিকে চোখে পড়ল ছোট্ট একটা পার্ক—লোহার গেট, ভেতরে দু–একটা বেঞ্চ, মাঝখানে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরোনো গাছ। গাছের তলায় কিছু বাচ্চা বল খেলছে, এক কোণে দুই বৃদ্ধ ধীরে–ধীরে হাঁটছে।

অরিন্দম থেমে গেল।

“এই পার্কটাকে আমি অনেকদিন ধরে দেখি,”—সে বলল, “প্রমোশন হওয়ার পর থেকে অফিস থেকে একটা গাড়ি দিয়েছে। এখন নিজের হাতে গাড়ি চালিয়ে যাই–আসি। সকাল-বিকাল প্রতিদিন এই রাস্তাটা দিয়ে যাই, গাড়ির কাচের ওপার থেকে দেখি—এই গাছ, এই বেঞ্চগুলো। প্রতিবার মনে হয়, কোনোদিন যদি গাড়ি থামিয়ে নেমে ভেতরে গিয়ে একটু বসতাম। কোনোদিন নামিনি।”

অনিন্দিতা গেটের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“এখনও গাড়ি নিয়েই ফিরতে পারবেন, কিন্তু আগে একটু হেঁটে ঢুকতে দোষ কী?”
অরিন্দম হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“মজার ব্যাপার জানো? গাড়ি পাওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছিল—আমার সব পথ যেন নিজ নিয়ন্ত্রণে। কখন কোথায় থামব, সেটা আমিই ঠিক করি। অথচ এই ছোট্ট পার্কটার সামনে গিয়ে কোনোদিন ব্রেক কষে দাঁড়ায়নি।”
অনিন্দিতা নরম স্বরে বলল,
“স্টিয়ারিং হাতে থাকলে মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়—কিছু রাস্তা আছে, যেখানে গাড়ি থামিয়ে নামতেই হয়। সব পথ গাড়ি থেকে দেখা যায় না, কিছু পথ হাঁটতে হয়।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
“চলুন, আজ সেই পথটা সামান্য হাঁটা যাক।”

অনিন্দিতা গেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ একটু ভেতরে গেলে ক্ষতি কি ?”
অরিন্দম একটু চমকাল।
“পার্কে যাব?”
“এক কাপ চা খেতে ক্যাফেতে যেতে পারেন, পার্কে ঢুকতে পারবেন না?”—অনিন্দিতা হেসে বলল, “আপনি কি সব কিছুর আগে অন্যের চোখ কল্পনা করেন?”

এই কথাটাই আসলে অরিন্দমের ভিতরের খাঁটি সত্যি—
সে সবসময় ভাবে,
“কে কী ভাববে?”
“বাড়িতে কী বলব?”
“অফিসে কেউ দেখলে কী বলবে?”

সে থেমে থেকে বলল,
“হয়তো করি। ছোট থেকে শিখেছি, যা করব, ভাবতে হবে—‘লোকটা কী বলবে’!”
“আর আমি ছোট থেকে শিখেছি—লোকের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের জীবনের অর্ধেক কেটে যায়,”—অনিন্দিতা বলল, “চলুন, আজ একটু ‘লোকের কথা’ বাদ দিই।”
পার্কের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অরিন্দম হঠাৎই সচেতন হয়ে উঠল—এতক্ষণ শুধু কথা শুনছিল, এবার প্রথমবার চোখটা একটু বেশি স্থির হল অনিন্দিতার মুখের দিকে।

অনিন্দিতা অসম্ভব সুন্দরী—তা প্রথম দিন থেকেই জানত সে; তবে এ সৌন্দর্য সেই চটকদার, চোখে পড়ার মতো নয়, বরং এমন এক টান, যার জন্য বারবার চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেও আবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে। গায়ের রং উজ্জ্বল না, তবু চোখদুটো এত গভীর, হাসিটা এত শান্ত আর ভদ্র, আর চলাফেরায় এমন এক মেপে রাখা মর্যাদা আছে যে, ভিড়ের মাঝেও তাকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়।

নিজের ভেতরে অরিন্দম একটু অস্বস্তি টের পেল—
“এই মেয়েটার সৌন্দর্য আমি আজকের আগে কোনোদিন এভাবে খেয়াল করিনি, নাকি খেয়াল করেও নিজের কাছে স্বীকার করিনি?”
বাইরের দিকে সে কিছুই প্রকাশ করল না, শুধু গেটটা ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকতে–ঢুকতে বলল,
“চল, দেখি তো, এতদিন গাড়ির কাচের ওপার থেকে যে পার্কটাকে দেখেছি, ভেতর থেকে কেমন লাগে।”

গেটটা হালকা ঠেললেই কচ শব্দ করে খুলে গেল।

ক্রমশঃ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top