লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.২

সুতপা খাতাটা দেখিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“এই “লাবণ্য তৃষ্ণা” টা  কি তুমি জানো?”
অনিন্দিতা কাগজের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে খুব আস্তে বলল,
“নামটা শুনেছি, বাকিটা জানি না। তবে যদি সত্যি জানতে চান—ও কোথায় গেছে, কেন গেছে—তবে হয়তো এই খাতার শুরু থেকেই শুরু করতে হবে। ওর আর আমার গল্প যেখানে প্রথম বাঁক নিয়েছিল, সেই বিকেল থেকে।”

অধ্যায় একঃ সেই বিকেল, যখন সব বদলে গেল

সেদিনও ভাবিনি, অফিসের অর্ধেক–ছুটির একটা নিরীহ বিকেল পুরো জীবনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
আগের বছরের মতোই পুজোর আগের শুক্রবার—কোম্পানির নিয়মিত “হাফ–ডে”। দুপুর দেড়টার মধ্যে ফ্লোর প্রায় ফাঁকা। কেউ নিউ মার্কেটে যাবে, কেউ সিনেমা ধরবে, কেউ বউ–বাচ্চা নিয়ে পার্কে।

অফিসের পঞ্চম তলার করিডোর তখন এক অদ্ভুত নীরবতায় ভরে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি–ঠাট্টা, গলার স্বর, প্রিন্টারের শব্দ মিশে ছিল, এখন সেখানে শুধু এসি–র মৃদু ঘোঁৎঘোঁৎ আর দূরের কোনো ফোনের বিচ্ছিন্ন রিং।
অরিন্দম রায় নিজের কেবিনে বসে ফাইল গুছিয়ে নিচ্ছিলো। এই অভ্যাস সে এখনও ছাড়তে পারেনি—
ছুটি মানে আগে বেরিয়ে যাওয়া নয়,
ছুটি মানে আগে সব গুছিয়ে রেখে যাওয়া।
ডেস্কের উপর ল্যাপটপ, পাশেই ছোট ডায়েরি, তার ওপরে বাঁকা হরফে লেখা—
“ফেস্টিভাল বোনাস আসলে মায়ের ঔষধের দোকানের বাকি টাকা মিটবে কি না, আগে সেটা ভাবা দরকার।”

হঠাৎ করিডোর থেকে একটা নরম গলার ডাক ভেসে এল,
“অরিন্দমদা, যাবেন না?”
কেবিনের কাচের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল—HR–এর ছোট কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে অনিন্দিতা। গায়ে অফ–হোয়াইট কুর্তা, চুল আলগা খোপা করা, চোখে একটা ব্যস্ত কিন্তু খালি হয়ে আসা বিকেলের ক্লান্তি। হাতে একটা ফাইল, আর অন্য হাতে টিফিনবক্স।
অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকাল—দুপুর দুটো।
“যাবো… আর পাঁচ মিনিটে।”
অনিন্দিতা হেসে বলল,
“৫টা মিনিট–দশটা মেইল–একটা ফোন—তারপর আবার কাটা বাস্তব।”

এইভাবেই সে কথা বলে—আধা সিরিয়াস, আধা ব্যঙ্গ, কিন্তু কখনোই কটু নয়।
অরিন্দম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কেবিনের লাইট অফ করতে–করতে বলল,
“তোমারও তো যাওয়ার কথা। এত ফাইল নিয়ে বসে আছ?”
“ফাইল তো শেষ,” অনিন্দিতা কাঁধ ঝাঁকাল, “আপনাদের সবার ছুটি মেলালাম, ছুটির বেতন মেলালাম, কে কতো ইনক্রিমেন্ট পাবেন, সেটা হিসেব করে দেওয়ার পর নিজের জন্য হিসেব করার মতো কিছু তো থাকে না।”
অরিন্দম একটু থমকে তাকাল,
“নিজের জন্য?”

“হ্যাঁ,”—অনিন্দিতা হেসে বলল, “আজকে যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে—‘অনিন্দিতা, তুমি কোথায় যাবে?’—তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, আমার আসলে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই ভাবছি, অফিসেই আরেকটু থাকি।”
কথাটা সে হালকা ভাবে বলেছে, কিন্তু শেষ লাইনের ভেতরে একটি খালি ঘরের প্রতিধ্বনি যেন কানে বাজল।
অরিন্দম একটু ঠাট্টার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ি নেই?”
“আছে,”—সে সোজা উত্তর দিল, “ভাড়া করা একটা ছোট রুম। তাকে কি ‘বাড়ি’ বলা চলে?”

দু’জনের মধ্যে খানিকটা নীরবতা নেমে এল। করিডোরের এ–কোনায়, ও–কোনায় আলো–ছায়া পালটে যাচ্ছে; লিফটের সামনে “লিফট আউট অফ সার্ভিস” লেখা কাগজ দুলে উঠছে এ–সি–র হাওয়া লাগিয়ে। অরিন্দম হঠাৎ বলে উঠলো,
“একটা কাজ করি?”

1 thought on “লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.২”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top