পরের দিন সকালে অ্যালার্মের হালকা আওয়াজে সবার আগে সুতপারই ঘুম ভাঙল। পাশে তাকিয়ে দেখল অরিন্দম তখনও গভীর ঘুমে, মুখে ক্লান্তির রেখা তবু একটু নরম হয়ে এসেছে। সে ধীরে উঠে বসে, খুব সাবধানে বিছানা ছাড়ল, যাতে অরিন্দমের ঘুম না ভাঙে।
ঠাকুরঘরে যেতে যেতে তার মুখের কোণে একটুখানি অপরিচিত হাসি ছিল—না খুব স্পষ্ট, না পুরো লুকোনো। যেন নিজের ভেতরে একটা কথা সে প্রথমবার ফিসফিস করে বলল,
“এই মানুষটার জন্যই তো এত কিছু।”
অরিন্দমের ঘুম ভাঙবে একটু পরে—অফিস, টিফিন, কাজের চাপ, সব আবার ফিরে আসবে একই ছন্দে। কিন্তু গত রাতের সেই অন্ধকার, নরম নীরবতা আর কাছাকাছি আসার মুহূর্তটা দু’জনের মধ্যেই কোথাও জমে থাকবে, কেউ মুখে আনবে না—তবু সেটা তাদের দাম্পত্যের নীরব, কিন্তু সত্যিকারের একটা স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।. সেই রাতের পর দিনগুলো আবার তাদের পুরোনো ছন্দেই চলতে লাগল। সকালে সুতপা পুজো, রান্না, নীলিমার সকালের চা; অরিন্দম অফিসের জন্য বেরোনোর আগে টিফিন হাতে নেওয়া; নীলিমার হাঁটুর ব্যথা, বাজারের তালিকা, মাসের মাঝামাঝি এসে টাকার হিসেব—সবকিছু এক নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে ঘুরতে লাগল।
কিন্তু ওই বৃত্তের ভেতরে দু–একটা ছোট জায়গা থেকে গেল, যেখানে শব্দ কম, কিন্তু অনুভূতি একটু বেশি ঘন।
সুতপার নীরব ভালোবাসা
সুতপার ভালোবাসার ভাষা ছিল খুব নিঃশব্দ। সে ভালোবেসে কাউকে “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার মধ্যে কোনো জরুরি বিষয় খুঁজে পেত না; বরং সে বিশ্বাস করত, একজন মানুষকে কীভাবে প্রতিদিনের ক্ষুদ্র কাজে আপনি মনে রাখেন, কীভাবে নিজের সময় আর পরিশ্রম তাকে একটু সহজ করে দেন—ভালোবাসা মূলত তাতেই।
এক বিকেলে, অফিস থেকে ফিরে অরিন্দম দেখল, তার পুরনো শার্টগুলো এক এক করে ধুয়ে রোদে শুকোতে দেওয়া হয়েছে, আর সুতপা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কলারের ভাঁজগুলো ঠিক করে দিচ্ছে।
“এত কষ্ট করছো কেন?”
সুতপা তাকিয়ে বলল,
“এই শার্টগুলো কি তোমার আর আমার শত্রু নাকি? এতদিন পর একটু ভালো করে ধুয়ে দিলাম, তাতেই কষ্ট?”
অরিন্দম হাসল, কিন্তু মনে মনে বুঝল—সে যতটা ক্লান্ত হয়, তার চাইতে বেশি ক্লান্তি সুতপার শরীরে জমা হয়, আর সে তাও কাউকে জানাতে চায় না।
নীলিমার সঙ্গেও সুতপার সম্পর্ক দিন দিন আরো গভীর হয়ে গেল। শাশুড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন বউ–শাশুড়ির প্রচলিত টানাপড়েন পেরিয়ে মেয়ে–মায়ের জায়গায় পৌঁছোচ্ছিল। সন্ধ্যেবেলা দু’জনে বারান্দায় বসে থাকতেন, নীলিমা অল্পস্বরে কোনো পুরনো কথা বলতেন, সুতপা মন দিয়ে শুনত, মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করত। অনেক সময়ই অরিন্দম বাইরে থেকে এসে দেখত—দু’জন মানুষ কথা বলছে, আর সে যেন একটু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় ব্যক্তি।
তবু এতে সে কোনো কষ্ট পেত না, বরং স্বস্তি পেত। নীলিমা আর একা নন, সুতপাও নিজের মতো করে এই বাড়িটাকে নিজের বানিয়ে নিয়েছে—এটুকু ভাবলেই তার ভেতরে একটা নিশ্চিন্তির ঢেউ উঠত।
অরিন্দমের নীরব ক্লান্তি
অফিসের জীবন ইদানিং একেবারে থেমে থাকা নদীর মতো নয়। প্রেজেন্টেশন, প্রজেক্ট, টার্গেট, ডেডলাইন—সব মিলিয়ে অরিন্দমের প্রতিদিন যেন একটা দীর্ঘ ট্র্যাক মিট। বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু দায়িত্বের পরিমাণ এখনও বাড়ছে; বেতন বাড়ছে অল্প অল্প করে, কিন্তু চাহিদা আর কাজের চাপ তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে।
একদিন ম্যানেজার তাকে আলাদা করে ডেকে বললেন,
“দেখুন, আপনাকে আমরা নতুন ক্লায়েন্টের প্রজেক্টে রাখতে চাই। একটু বেশি সময় দিতে হবে, মাঝে মাঝে হয়তো ছুটির দিনেও অফিস আসতে হতে পারে। পারবেন?
“চেষ্টা করব, স্যার।”
সে জানত, “চেষ্টা করব” মানে আসলে করতে হবে। এই কাজ হাতছাড়া করলে সামনে এগোনোর সুযোগও অনেকটা কমে যাবে। বাড়ি ফেরার সময় বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে ভাবল, “আমি ক্লান্ত, বাস্তবিকই ক্লান্ত… কিন্তু থামার উপায় নেই।”
বাড়ি ফিরে সুতপা যখন রাতের খাবার সামনে রাখল, সে একটু দোটানায় পড়ে গেল—নতুন প্রজেক্ট, অতিরিক্ত কাজের কথা বলবে কি বলবে না। শেষে বলেই ফেলল,
“শুনো, সামনে কয়েক মাস আমাকে হয়তো একটু বেশি সময় অফিসে থাকতে হবে।”
সুতপা চামচ হাতে তাকাল,
“বেশি সময় মানে? খুব রাত করে ফিরতে হবে?”
“হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে। আর… ছুটির দিনেও হয়তো যেতে হতে পারে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুতপা শুধুই বলল,
“ঠিক আছে, তুমি তো খারাপের জন্য বলছো না। কাজ তো করতেই হবে।”
এই “ঠিক আছে” বলার সময় সুতপার চোখে সামান্য হতাশা ছিল; হয়তো সে ভেবেছিল, পরের পুজোয় একটু শহরের বাইরে যাবে, কোনো আত্মীয়ের বাড়ি, অথবা শুধু একদিন অরিন্দমকে নিয়ে গঙ্গার ঘাটে বসে থাকবে বেশি সময়। কিন্তু সে কিছু বলল না। তার স্বভাবই ছিল না কথা টেনে নিজেকে সামনে আনা।
অরিন্দম বুঝতে পারল, তার সিদ্ধান্তে সুতপার মনে একটু ধাক্কা লেগেছে, তবু সে কিছু চায়নি, কিছু বলেনি। এই নীরব গ্রহণ করার ক্ষমতা অরিন্দমকে একদিকে আশ্বস্ত করত, অন্যদিকে কোথাও যেন অস্বস্তিও দিত—যে মানুষ কখনো নিজের ইচ্ছে নিয়ে মুখ খোলে না, তাকে আসলে কতটা চেনা যায়?
ছোট্ট একটা চেষ্টা
কিছুদিন পর এক শুক্রবার অরিন্দম একটু আগে কাজ শেষ করতে পারল। ম্যানেজার হালকা মুডে ছিল, বলল,
“আজ বেরিয়ে যান, কাল থেকে আবার যুদ্ধ শুরু।”
অরিন্দম বাসে উঠে বসে হিসেব করল—এখন বাড়ি ফিরে গেলে ঠিক সন্ধ্যার আলো আঁধারির সময় বাড়ি পৌঁছবে। তার মাথায় হঠাৎ ছোট্ট একটা ভাবনা এল—অফিস থেকে সরাসরি কোনো দোকানে ঢুকে সুতপার জন্য কিছু নেওয়া যায় কি না।
বাজারের একটু বড় গলির ভেতরে একটা শাড়ির দোকানে ঢুকল সে। আলো ঝলমলে, টেবিলের ওপর একের পর এক কাঁথা, শাড়ি, ড্রেস ম্যাটেরিয়াল। দোকানদার হাসতে হাসতে সামনে কয়েকটা উজ্জ্বল রঙের শাড়ি ফেলে দিল—চকচকে লাল, উজ্জ্বল নীল, ঝকমক করা সবুজ। অরিন্দম সেগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা অস্বস্তি অনুভব করল; মনে হলো, এগুলো সুতপার সঙ্গে ঠিক মানাবে না।
“আর কিছু আছে? একটু কম উজ্জ্বল, শান্ত রঙের?”
দোকানদার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে আরও কিছু শাড়ি এনে রাখল—হালকা হলুদ, ফিকে গোলাপি, মাটির মতো স্নিগ্ধ বাদামি। অরিন্দম এক একটা শাড়ির ওপর হাত রাখল, কল্পনা করার চেষ্টা করল—এই রঙটা সুতপার গায়ের সঙ্গে কতটা মানাবে, তার নরম স্বভাবের সঙ্গে কোথায় মিশবে। অনেকক্ষণ দেখে শেষে একটা খুব সাদামাটা, অফ–হোয়াইটের ওপর হালকা সবুজ আঁচলওয়ালা শাড়ি বেছে নিল।
বাড়ি ফিরে সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্যাকেটটা সুতপার হাতে দিল।
“তোমার জন্য।”
সুতপা প্রথমে কিছু বুঝল না, কপাল কুঁচকে তাকাল,
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। পছন্দ না হলে, বদলে নিতে পারো ।”
সুতপা প্যাকেট খুলে শাড়িটা হাতে নিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার চোখে একদম শিশুর মতো আনন্দের ঝিলিক।
“কী সুন্দর রঙ…!”
তারপর যেন একটু লজ্জা পেল,
“তুমি না বললেই পারতে। কত টাকা লাগল?”
অরিন্দম হেসে বলল,
“তোমার এই কথাটা শুনবো বলেই কিনেছি।”
এই ছোট্ট মুহূর্তটা সত্যিকারের উষ্ণতায় ভরা ছিল। সুতপা সেই রাতে শাড়িটা খাটের পায়ের দিকে সাবধানে ভাঁজ করে রেখে দিল, যেন এটি কেবল কাপড় নয়—অরিন্দমের নজর, তার ভাবনা, তার যত্ন।
অরিন্দমও মনের ভেতরে একধরনের সন্তুষ্টি অনুভব করল। সে নিজেকে বলল, “সব রোমান্স কি সিনেমার মতোই হতে হবে? হয়তো কারও প্রিয় রং ঠিকমতো চিনে নিতে পারাও একধরনের রোমান্স।”
তবু কোথাও একটু একা
এভাবে, একদিকে সুতপার নীরব ভালোবাসা আর অন্যদিকে অরিন্দমের বাড়তে থাকা দায়িত্ব—দুয়ে মিলে একটা খুব স্থিত, শান্ত সংসার গড়ে উঠছিল। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বলবে, “কি সুন্দর সংসার!”
কিন্তু সব সুন্দর সংসারের মতো এ সংসারেও কিছু অদেখা জায়গা ছিল।
রাতে অনেক সময় যখন নীলিমা ঘুমিয়ে পড়েন, সুতপা পাশের ঘরে কাপড় ভাঁজ করে, রান্নাঘর গুছিয়ে শুতে আসে, অরিন্দম তখন বই হাতে নিয়ে থাকে। বইয়ের পাতা নাড়ালেও অনেকসময় তার চোখ পাতার অক্ষরগুলো ঠিকমতো ধরে না; বরং কোথাও দূরে তাকিয়ে থাকে। সে ভাবতে থাকে—আজ সারাদিন অফিসে যা যা ঘটল, তার ক্লান্তি, অস্বস্তি, কষ্ট—এসব কিছু সে যদি কথায় বলতে চাইত, কাকে বলত?
সুতপার কাছে সে বলতে পারে, তাতে সংশয় নেই। কিন্তু বলতে গেলে হয়তো সুতপা একটা সহজ উত্তর দেবে, “সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এত চিন্তা করো না।” এই কথাটা ভুল নয়, তবু তার সবটা জুড়ে না। অরিন্দম অনুভব করে, তার ভেতরে যে অনিশ্চয়তা, যে অদ্ভুত আফসোস, যে অজ্ঞাত রাগ—সেগুলোকে কথায় বাঁধতে হলে এমন কারো দরকার, যে শুধু সান্ত্বনা দেবে না, মাঝে মাঝে তাকে প্রশ্নও করবে, পাল্টা কথা বলবে, তার সমস্ত আবেগকে একটু নেড়ে দেবে।
এই চাওয়ার কথা সে নিজেকেও পুরো বলে উঠতে পারে না।
সুতপা এদিকে ভাবতে থাকে—স্বামী ভালো আছে তো? কাজের চাপ যেন বেশি না হয়। রাতে অনেক সময় সে চুপ করে অরিন্দমের ঘুমন্ত মুখ দেখে। বুকের ভেতরে নরম একটা কৃতজ্ঞতা জমে ওঠে—এই মানুষটির সঙ্গে সংসার করতে পারা, তার দায়িত্বের পাশে থাকতে পারা তাকে একধরনের মানসিক নিরাপত্তা দিয়েছে। সে ভাবতে পারে, “আমার মানুষ আছে।” তার কাছে এটাই অনেক বড় কথা।
দুজনই একে অপরকে ভালোবাসে, নিজ নিজ ভাষায়, নিজ নিজ কল্পনায়। কেউ গলা উঁচিয়ে “ভালোবাসি” বলে না, কেউ নাটকীয় দৃশ্যের দাবি করে না। তবু ডাল–ভাত–ডালনার ভেতর দিয়ে, শাড়ির ভাঁজের মধ্যে, রাতের শেষে মাথার কাছে রাখা গ্লাস জলের মধ্যে দিয়ে, হালকা কাশির শব্দে উঠে গিয়ে জল ধরিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে ভালোবাসা নিজেদের মতো করে কাজ করে যায়।
কিন্তু প্রতিদিনের এই নিখুঁত অভ্যাসের ভেতরেও, অরিন্দমের ভেতরে অল্প অল্প করে জমতে থাকে আরেকটা অনুভূতি—নিজের কথা শোনানোর এক অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা, নিজের ক্লান্তি, নিজের রাগ, নিজের অব্যক্ত স্বপ্নকে একটু “সেন্টার স্টেজ”-এ বসিয়ে দেখার ইচ্ছে। সে তা বোঝে না, নামও দিতে পারে না; তাই আপাতত এটাকে সে শুধু “ক্লান্তি” বলে ভাবে, আর সুতপার শান্ত মুখ দেখে নিজেকে বোঝায়— “সব ঠিক আছে, এই পর্যন্ত থাকলেই তো হয়।”
অরিন্দম এইভাবেই নিজেকে বুঝিয়ে–বুঝিয়ে দিন কাটাতে লাগল। বাইরে থেকে দেখলে তার জীবনে অভিযোগ করার মতো তেমন কিছুই নেই—নিরাপদ চাকরি, স্নিগ্ধ সংসার, দায়িত্ববান স্ত্রী, ধীরে ধীরে সেরে ওঠা মায়ের স্বাস্থ্য। তবু নিজের ভেতরে যখন সে একা থাকে, তখন মাঝে মাঝে মনে হয়—এত সবের মাঝেও যেন কোথাও একটু জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে, যেখানে শুধু তার নিজের কথাগুলো রাখা যায়, অন্য কারও নয়।


