লাবণ্য তৃষ্ণা – সংখ্যা ১.০.৯

একদিন শনিবার সন্ধ্যায়, অফিস থেকে একটু আগে ফিরতে পেরে অরিন্দম দেখল, সুতপা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাপড় গুছোচ্ছে। আকাশে তখন কমলা রঙের শেষ আলো, গলির বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে, বলের শব্দ, বিক্রেতার হাঁক, আর দূরে কোথাও ভেসে আসছে মন্দিরের ঘণ্টা। অরিন্দম হঠাৎ বলেই ফেলল,
“কাল যদি ছুটি পাই, একটু বাইরে বেড়িয়ে আসা যায় নাকি?”
সুতপা চমকে তার দিকে তাকাল, তারপর আবার কাপড় ভাঁজে মন দিল।
“কোথায়?”
“একটু দূরে কোথাও। নদীর ধারে, না হয় পার্কে, সিনেমা হলে… যা ইচ্ছে।”

“সিনেমা হলে…”—শব্দটা সুতপার কাছে কেমন যেন নতুনের মতো।  সে ছোটবেলা থেকে খুব বেশি সিনেমা দেখতে যায়নি; বাবা–মা’র কাছে ওসব ছিল একটু বাড়তি বিলাস। বিয়ের পরেও সিনেমা মানে তার কাছে টিভিতেই যা হোক, সেইটুকু। তবু সে অরিন্দমের মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“যদি বাইরে যেতেই হয়…”—সে একটু থামল—“কোনো ভালো মন্দিরে যাওয়া যায় না? অনেকদিন ভালো করে পুজো দেওয়া হয় না। তুমিও না… অনেকদিন কোথাও মাথা ঠেকাতে যাওনি।”

অরিন্দমের মুখে তখন একরকম কৌতুক–মেশানো নিরাশা এসে ভিড় করল। সে ভেবেছিল নদীর ধারে বিকেল, হয়তো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সুতপার সঙ্গে একটু খোলামেলা কথা বলা, তার ভিতরের ক্লান্তি আর ছোট্ট স্বপ্নগুলো শেয়ার করা—একটু “স্বামী–স্ত্রী” হয়ে থাকা, “দায়িত্ব–অনুষঙ্গ” না হয়ে। তার কল্পনায় যে রোমান্টিক ঘোরাঘুরি, সুতপার কল্পনায় তার জায়গা দখল করে আছে পুজো, মন্দির, প্রণাম, প্রসাদ।

কিন্তু অরিন্দম সোজা “না” বলতে পারল না। অনেকটা কথাবিহীন মুহূর্তের পর সে কেবল বলল,
“মন্দিরেই যাবো তাহলে। তুমি একটু দেখে রেখো কোথায় গেলে ভালো হয়।”
সুতপা চোখ নামিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

পরের দিন সকালে তারা সত্যিই মন্দিরে গেল। বাস ধরে, একটু হেঁটে, ভিড়ের মাঝখান দিয়ে সুতপা চাপা উত্তেজনায় এগিয়ে গেল সামনে। হাতে ফুল, সঙ্গে ছোট্ট থালা, ঠোঁটের কোণে নরম হাসি। অরিন্দম পাশে পাশে হাঁটল, ভিড়ের ভেতরে এক মুহূর্তের জন্যও সুতপার হাত ছেড়ে দিল না। ভেতরে ঢুকে যখন সুতপা চোখ বন্ধ করে প্রণাম করছিল, ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে ধূপের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে নিজের অদৃশ্য কথাগুলো বলছিল, তখন অরিন্দম তার মুখের ওপর পড়া আলো দেখে বুঝল—এই মেয়ের কাছে এইটাই রোমান্স, এইটাই পূর্ণতা।

মন্দির চত্বরের বাইরে এসে সুতপা খুব খুশি গলায় বলল,
“এতদিন পর ভালো করে পুজো দেওয়া হলো, মনটা একদম হালকা লাগছে।”
অরিন্দম হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“হুঁ, ভালোই।”

কিন্তু তার ভেতরে কোথাও যেন একটু ফাঁকা থেকে গেল। সারাদিনের এই মন্দির–যাত্রা, প্রণাম, প্রসাদের মিষ্টি—সবকিছুর মাঝেও সে খুঁজে বেড়াল অন্যরকম কিছু—হয়তো কোনো আলাদা কথা, কোনো অপ্রকাশিত ইঙ্গিত, কোনো সাঁঝবেলার নরম হাঁটা—যা একটু “তাদের দুজনের” হতো, বাকি পৃথিবী থেকে আলাদা। সেটা পুরোপুরি সে পেল না।

বাড়ি ফেরার পর রাতে, সুতপা যখন ঠাকুরঘরে প্রদীপ নিভিয়ে ঘুমোতে আসছিল, অরিন্দম অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে ভাবল—
“সে হয়তো আমায় কম ভালোবাসে না, বরং বেশি। কিন্তু আমার ভালোবাসার ভাষা আর তার ভালোবাসার ভাষা… দুটো বোধহয় আলাদা।”

এই ছোট ছোট পার্থক্যগুলো সে মুখে আনে না, কোনো অভিযোগও করে না। কিন্তু এভাবেই নিঃশব্দে জমতে থাকে তার ভেতরের তৃষ্ণা—একদিন কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলার, হাত ধরে শুধু হাঁটার, কোনো মন্দির, কোনো দেবতার নামের আড়াল ছাড়াই একেবারে মানুষ–মানুষ হয়ে পাশে থাকার।

নিশুতি রাত, অদৃশ্য ফাঁক

মন্দির থেকে ফিরে সেদিন রাতটা অন্য অনেক রাতের মতোই ছিল, তবু খুব অল্প ক’টা জায়গায় আলাদা। বাড়ি ফিরে সুতপা প্রথমেই ঠাকুরঘরে গেল, থালার ফুল পাল্টাল, প্রসাদের একটু অংশ আলাদা করে রাখল নীলিমার জন্য। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে গেল চুপচাপ। অরিন্দম বসার ঘরে বসে এক গ্লাস জল খেতে খেতে লক্ষ্য করল—সুতপা অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরা। যেন পুরো দিনের ক্লান্তি পুজোর ভিড়েই কোথাও ভেঙে গিয়েছে।

“প্রসাদটা খেয়ে নাও,” সুতপা এসে বলল, হাতের ছোট্ট বাটিতে একটু মিষ্টি আর ফল এগিয়ে দিয়ে।
“হঁ, দাও,” অরিন্দম নিয়ে মুখে দিল। মিষ্টিটার স্বাদ আলাদা কিছু ছিল না; তবু সুতপার মুখের তৃপ্তিটা দেখে সে নিজের ক্লান্তিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিল না।

রাতে খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, সুতপা ধীরে ধীরে বলল,
“আজ তোমার অনেক কষ্ট হলো, তাই না?”
“কেন?”
“এতটা পথ, এত ভিড়… তাও আমার জন্য গেলে। তুমি চাইলে তো অন্য কোথাও যেতে পারতে।”
অরিন্দম একটু চুপ করে থেকে বলল,
“ঠিক আছে, মাঝে মাঝে তোমারও তো ভালো লাগা দরকার। আর তুমি যখন ভালো থাকো, আমারও খারাপ লাগে না।”

সুতপা এই সহজ কথার ভেতরেই অনেকটা স্নেহ শুনে নিল। সে কখনো ভাবেনি, কেউ তার ভালো লাগার কথা আলাদা করে ভাবতে পারে। তার চোখে ক্ষণিকের জন্য একটা নরম আলো ফুটে উঠল, যা অরিন্দম লক্ষ্য করল, কিন্তু তেমন কিছু বুঝল না।

ঘুমোতে যাওয়ার সময় ঘরটা পুরো অন্ধকার। জানলার ফাঁক দিয়ে একটু হলদেটে আলো এসে পড়েছে, পাশের ঘরে নীলিমার কাশির হালকা শব্দ। সুতপা পাশ ফিরে শুয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“পরের বার গেলে… আরেকটা মন্দিরে যাই না?”
অরিন্দম ক্লান্ত গলায় বলল,
“দেখা যাবে।”

রাতটা তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। জানলার কাঁচে বাইরে রাস্তার আলো মৃদু প্রতিফলন রেখে গেছে, পর্দার ফাঁক দিয়ে সেই আলো এসে বিছানার এক কোণে পড়ে আছে। নীলিমার ঘর থেকে হালকা কাশির শব্দ ভেসে এলো, তারপর সব নিরব। ঘরটা অদ্ভুত নরম অন্ধকারে ভরে আছে—যেন দিনের সমস্ত ব্যস্ততা, শব্দ আর আলোকে কেউ বাইরে রেখে দরজা আটকে দিয়েছে।

সুতপা চুপ করে উঠে গিয়ে জানলার কাছে একটু দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে গলির একদিক থেকে ভাজা কোনো কিছুর গন্ধ আসছে, হয়তো কেউ দোকান গুটোচ্ছে। সে ধীরে পর্দাটা টেনে দিল, যেন বাইরের পৃথিবীটাকে আরেকটু দূরে সরিয়ে রাখতে চাইল। তারপর নিঃশব্দে এসে বিছানার তার দিকটায় শুয়ে পড়ল।

অরিন্দম তখন পাশে পড়ে থাকা বইটা বন্ধ করে রাখল। আলো নিভিয়ে দিতে যেতে গিয়ে একবার সুতপার দিকে তাকাল। অল্প আলোতে তার মুখটা শুধু অস্পষ্ট রেখায় বোঝা যায়—কপালের কাছে চুলের গোছা নেমে এসেছে, চোখদুটো যেন একটু ক্লান্ত, আবার কোথাও শান্তও।

“ঘুম পাচ্ছে?” অরিন্দম আস্তে জিজ্ঞেস করল।
“হুঁ… একটু,” সুতপা পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, “তোমার তো ক্লান্তি বেশি।”

অরিন্দম আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকার হঠাৎ একটু ঘন হয়ে উঠল, কিন্তু তাতে ভয় নেই, বরং একটা আড়াল পাওয়া গেল—যেখানে কথা না বলেও অনেক কথা বলা যায়। কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপচাপ শুয়ে রইল। এ নীরবতা অস্বস্তিকর ছিল না, আবার পুরো স্বস্তিকরও না—মাঝের কোথাও।

শুয়ে শুয়ে অরিন্দম হঠাৎ অনুভব করল, দিনের সমস্ত ক্লান্তি সত্ত্বেও তার ভিতরে একটা হালকা অস্থিরতা রয়ে গেছে। বাইরে মন্দিরে যাওয়ার আবদার, সুতপার খুশি, নিজের অদৃশ্য হতাশা—সব মিলিয়ে একটা জট পাকানো গিঁট। সে বুক ভরে শ্বাস নিল, তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সুতপার কাঁধে আলতো ছোঁয়া দিল।

সুতপা একটু চমকে উঠল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিল। অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না, তবু দু’জনেই একে অপরের উপস্থিতি একটু অন্যরকমভাবে অনুভব করতে লাগল।

“তুমি… ঘুমাওনি এখনও?” সুতপা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“না,” অরিন্দম আস্তে বলল, “ঘুম আসছে না।”

সুতপা কোনো উত্তর দিল না। খুব আস্তে তার শরীরটা অরিন্দমের দিকে একটু সরে এল, যেন এক চুল দূরত্ব কমিয়ে দেওয়া। ঘরের ভেতর নরম শ্বাসের আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

এই ঘন অন্ধকারে, শব্দের আর আলো–আঁধারির মাঝখানে, স্বামী–স্ত্রীর দূরত্বটা সামান্য হলেও গলে যেতে শুরু করল। অরিন্দমের আঙুলের ডগায় সুতপার হাতের উষ্ণতা এসে লাগল, সুতপা সেই স্পর্শে কোথাও হয়তো একটু লজ্জা পেল, আবার এক অদ্ভুত নিশ্চিন্তিও অনুভব করল।

কথা খুব বেশি হলো না; কোনো নাটকীয় সংলাপ নেই, কোনো অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতিও না। শুধু ধীরে ধীরে, প্রায় শব্দহীনভাবে, দু’টো মানুষ একটু আরেকটু করে একে অপরের কাছে সরে এল—যেন সারাদিনের ক্লান্তি, ভুল বোঝাবুঝি আর অপ্রকাশিত অভিমানগুলোকে কিছুক্ষণের জন্য ভাঁজ করে রেখে দেওয়া গেল বিছানার এক পাশে।

সেই রাতে ওদের ঘরে খুব ছোট্ট, খুব স্বাভাবিক এক ভালোবাসার দৃশ্য ঘটে গেল—যার কোনো সাক্ষী নেই, কোনো আলো নেই, কোনো আড়ম্বর নেই। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেও পারত না; কিন্তু ওদের দুজনের মধ্যেকার দূরত্বটা সেখানে একটু নরম হলো, একটু উষ্ণ হলো।

কিছুক্ষণ পরে সুতপার কণ্ঠ খুব মৃদু হয়ে উঠল,
“আমার জন্য এত হাঁটাহাঁটি করলে… ক্লান্ত তো?”
অরিন্দম তার কণ্ঠের কাছে মুখ এনে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“ক্লান্তি খারাপ না… কাজের পরে যদি কেউ থাকে… এইভাবে পাশে।”

সুতপা কোনো উত্তর দিল না, শুধু তার বুকের ওপর মাথাটা আরেকটু গাঢ় করে রাখল। এই নীরব ভরসাটুকু, এই শারীরিক কাছাকাছি আসা—তার কাছে এও এক ধরনের পুজো, এক ধরনের প্রণাম, যেখানে দেবতা নয়, মানুষটাকেই সে সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছে।

ক্রমে শ্বাসের আওয়াজ ধীর হলো, শরীরগুলো ঢিল হয়ে এল, ঘরটা আবার নিস্তব্ধতায় ভরে গেল। বাইরে গলিতে কুকুরের ডাক, দূরের কোনো বাসের হর্ন—এইসব শব্দ অল্প সময়ের জন্য ঘরে ঢুকে আবার হারিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top