লোকটা হারিয়ে গেল।
এত চুপচাপ, এত ভদ্রভাবে হারিয়ে গেল যে, প্রথমে কেউ বুঝতেই পারল না—এই বাড়ির যে মানুষটা প্রতিদিন নিদিষ্ট সময়ে অফিস যায়, আবার প্রায় নিদিষ্ট সময়েই ফিরে আসে, সে আজ কোথাও নেই।
সাতটা বাজল, আটটা বাজল, তারপর সাড়ে আটটা।
কলকাতার ফাল্গুনের রাত নেমে এসেছে, গলির মোড়ের চায়ের দোকানটা গুটোচ্ছে। বারান্দার গ্রিলের ভিতরে দাঁড়িয়ে সুতপার গলা শুকিয়ে আসছে—এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে আঁচল চেপে ধরা।
“সকালে অফিসের জন্য বেরিয়েছে —তারপর?”
সে প্রথমে স্বামীর মোবাইলে একের পর এক কল করল—
“কল ফেইলড”, “সুইচড অফ”, “কল কনেক্টেড না।”
তারপর অফিসে ফোন করলো। রিসেপশনের মেয়েটা বলল,
“ম্যাডাম, অরিন্দমদা তো আজ অফিসেই আসেননি। ”
সুতপা আরও বেশি অস্থির হয়ে গেল।
সে চুপ থেকে আরও একবার ভাবল—অরিন্দম গেল কোথায়?
ঠিক তখনই তার মাথায় একটি নাম ভেসে উঠল—অনিন্দিতা।
HR–এর সেই মেয়ে, যার কথা সে শুনেছে অরিন্দমের মুখে, যার নাম সে নিজের সন্দেহেও উচ্চারণ করতে চায়নি অনেকদিন।
অনেক দ্বিধা নিয়ে শেষ পর্যন্ত নম্বরটা ডায়াল করল।
“হ্যালো… অনিন্দিতা?”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“আমি সুতপা। অরিন্দমের স্ত্রী। আজ ও অফিস যাবো বলে বেরিয়ে অফিস এ যায়নি। অফিস বলছে, অফিস এ আসেনি । আপনি কি জানেন, ও কোথায় গিয়েছে?”
ফোনের ওপারে একটু নীরবতা। তারপর অনিন্দিতা খুব শান্ত, প্রায় ভদ্র গলায় বলল,
“না, আজ আমার সঙ্গে ওর কোনো মিটিং ছিল না। আজ অফিসে আমিও ওকে দেখিনি। আপনার গলা শুনেই বুঝছি, অবস্থা খুব টেন্সড। আমি একটু আসছি আপনার কাছে। কথা বলে দেখি, কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কি না।”
সুতপা প্রথমে বলল,
“আপনাকে আসতে হবে না, আমি নিজেই—”
আবার নিজেই থেমে গেল।
একসময় সে বুঝল—
“আমি একা কিছু জানিই না। ওর অফিসের ভিতরের মানুষটা আমি যতটা কম চিনি, এই মেয়েটা হয়তো কিছুটা বেশি চিনে। যদি সত্যিই ওর কোনো খবর থাকে?”
শেষ পর্যন্ত শুধু এতটাই বলল,
“ঠিক আছে… আসুন।”
এইভাবে, প্রায় এক ঘণ্টা পর, দরজার বেল বেজে ওঠে।
সুতপা দরজা খুলতেই দেখে—সাদামাটা শাড়ি, গলায় ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দিতা সেন।
“আপনি এত রাতে…”
“আপনি ফোন করেছিলেন,” অনিন্দিতা আস্তে বলল, “বলেছিলেন, অরিন্দমদা অফিসে যান নি, কিন্তু আপনাদের কাছে বাড়িতেও এসে পৌঁছয়নি। তাই ভাবলাম, একবার এসে সবটা একসঙ্গে বসে বোঝার চেষ্টা করি।”
ঘরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল—ড্রইংরুমের টেবিলের ওপর খোলা পড়ে আছে মোটা একটা খাতা, মাথায় বড় করে লেখা—
“লাবণ্য তৃষ্ণা”
প্রথম পাতায় তিনটি লাইন—
“লোকটা হারিয়ে গেল। এত চুপচাপ, এত ভদ্রভাবে হারিয়ে গেল, যেন কোনোদিন কারও জীবনে জোর করে ঢুকে পড়ার ধৃষ্টতা তার ছিলই না। শুধু যেদিন সে দেখা দিল না, সেদিন সবাই প্রথমবার টের পেল—ও ছিল বলেই এতদিন সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল।” তার নীচেই—



ভালো লেখা। পরের সংখ্যার জন্য অপেক্ষা করে থাকলাম।